রোহিঙ্গা সংকট- রাখাইনে আরাকান আর্মির কার্যক্রম ও চলমান পরিস্থিতি

আন্তর্জাতিক এশিয়া মায়ানমার

রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার আর্মির সংঘর্ষ চলমান। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা চকপিউ টাউনশিপে আরাকান আর্মি আক্রমণ চালিয়ে কিছু এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। এই শহরতলীতে চীনের বেশ কয়েকটি মেগা-প্রকল্প রয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সেখানে নতুন করে সৈন্য পাঠাচ্ছে।

চকপিউ শহরের কাছে চলমান সংঘাতের সময় জান্তা ক্রমাগত বিমান এবং ড্রোন হামলা চালানোর পাশাপাশি মিয়ানমার নৌবাহিনীও প্রায় প্রতিদিনই গোলাগুলি চালিয়ে যাচ্ছে। চলমান সংঘাতের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকা থেকে পালিয়ে যাচ্ছে এবং রাখাইনে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব বাস্তুচ্যুত মানুষ খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে মানবেতর পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছে। রাখাইনে চলমান খাদ্য সংকটের কারণে তাদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনের পাশাপাশি অন্যান্য এলাকায় সংঘাত নিয়ন্ত্রণে প্রায়শ বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে চলছে।

থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্স এখন আগের মত সক্রিয় না হলেও আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যে জান্তার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি তারা ইরাওয়াদি রিজিওনের পাঁচটি শহরে জান্তার বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে চাপ বজায় রেখেছে। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের জান্তার দখলে থাকা মুনাউং শহরতলীতে হঠাৎ আক্রমণ চালানোর কারণে বর্তমানে জান্তা মুনাউং শহরতলীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং এলাকায়  টহল বৃদ্ধি করেছে। সামরিক জান্তা ড্রোন, বিমান হামলা এবং নৌ-কামান ব্যবহার করে আরাকান আর্মির অবস্থানে আক্রমণ করার কারণে মাঝে মাঝে তারা পিছু হটতে বাধ্য  হলেও গেরিলা কৌশল, কামান এবং স্নাইপার ব্যবহার করে আরাকান আর্মি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। এই সংঘাতের কারণে জান্তা বাহিনী ক্রমাগত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

সামনের দিনগুলোতে অন্যান্য ফ্রন্টে আক্রমণের তীব্রতা কমে আসলে মিয়ানমার জান্তা সেসব এলাকা থেকে সৈন্য সরিয়ে রাখাইনে তাদের অবস্থান দৃঢ় করতে পারে। রাখাইনে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে পারলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে নতুন করে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। বাংলাদেশের পাশে হওয়ায় বাংলাদেশকে রাখাইনের সংঘাতের  উপর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ পূর্বক  পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা ১৪টি শহরের মধ্যে থান্ডওয়ে, গে, টাউংআপ এবং আন-এ নির্বাচন পরিচালনার জন্য আরাকান আর্মির উপর চাপ প্রয়োগ করে এবং একই সঙ্গে  জান্তা বাহিনী এই চারটি জনপদ দখলের উদ্দেশে আক্রমণ শুরু করে। আরাকান আর্মির প্রতিরোধের মুখে তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং জান্তা বাহিনী পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। সামরিক বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত আসন্ন নির্বাচনের উপর রাখাইনের জনগণের আস্থার অভাব রয়েছে। সংঘাত চলমান থাকায় মিয়ানমার সরকার সিতওয়ে এবং চকপিউর বেশ কিছু কেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না বলে জানিয়েছে।

এর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এই এলাকাগুলোতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। নভেম্বর মাসে আরাকান আর্মি প্রধান জেনারেল তুন মিয়াত নাইং দৈনিক দি ইরাবতী দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানায়, রাজনৈতিক পদ্ধতির মাধ্যমে সামরিক সংঘাত এবং রাজনৈতিক সংকট সমাধান করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সকল জনগণের জন্য একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরন করে জনসমর্থন অর্জনের জন্য একটি সর্ব-অন্তর্ভুক্ত নির্বাচন হওয়া উচিত।

ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) মিয়ানমারের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, যদিও এন এল ডি ক্ষমতায় থাকার সময় আরাকান আর্মিকে কাল তালিকা ভুক্তকরা হয়েছিল তবুও এই বড় দল নির্বাচনে অংশ না নিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এন এল ডি ক্ষমতায় থাকার সময় আরাকান আর্মি যুদ্ধরত অবস্থানে থাকার কারনে পরিস্থিতি অন্য রকম ছিল, রাজনৈতিক ধারায় ফিরতে হলে সবাইকে সহনীয় হতে হবে এবং একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। আরাকান আর্মি প্রধানের মতে তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে বিপ্লব শুরু করেছিল এবং এখনো তা সফলতার মুখ দেখেনি। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের তীব্র সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।

আরকান আর্মি রাখাইনের জনগণের পাশে আছে এবং জনগণও শত বাধা বিপত্তির মুখে তাদেরকে সহায়তা দিয়ে চলেছে। আরাকান আর্মি তাদের দৃঢ় মনোবল নিয়ে লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে চলছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত তাদের বর্তমান অগ্রাধিকার। আরাকান আর্মির নেতৃত্ব দূর থেকে রাখাইনে যুদ্ধ পরিচালনা করার কারনে মাঠ পর্যায়ে কিছু সমস্যা ছিল, তারা এখন রাখাইনে অবস্থান নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিধায় সামনের দিনগুলোতে সেসব সমস্যা কমে যাবে বলে আশা করা যায়।

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তবে রাখাইন ও মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতিতে এই সমস্যা সমাধানের পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। আরাকান আর্মি প্রধান জানায়, তারা রাখাইনে গত ৭০ বছর ধরে মুসলিম এবং রাখাইন জনগণের মধ্যে সংঘাত নিয়েও আলোচনা করেছে। এসব সংঘাতের কারণে রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মাঝে সন্দেহ এবং ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও মানসিকতার পরিবর্তনে সময়ের দরকার, চাপ প্রয়োগ কিংবা দ্রুত এই সমস্যা সমাধান সম্ভব না। আরাকান আর্মি যেসব অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে সেসব এলাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈঠকে করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে এবং সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে একমত হয়েছে। আরাকান আর্মি প্রধানের মতে বর্তমানে মুসলিম এবং রাখাইন জনগণের মধ্যে সহাবস্থান সহনীয় হয়েছে। আরাকান আর্মি ধাপে ধাপে মুসলিম জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে এবং রাখাইন রাজ্য ও মিয়ানমারের প্রতি তাদের আনুগত্য, শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তারা কীভাবে সহযোগিতা করবে তা জানার চেষ্টা করছে।

বাস্তবতা হল, আরাকান আর্মি রাখাইনে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরও রোহিঙ্গারা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। রাখাইনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি এবং পুনর্বাসনের জন্য আরাকান আর্মিকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগগুলোকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

বর্তমানে রাখাইনে রোহিঙ্গা এবং রাখাইন উভয় সম্প্রদায় শোচনীয় পরিস্থিতিতে দিনযাপন করছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকানের স্থানীয় জনগণের বিরূপ মনোভাবের মধ্যে নাগরিক অধিকার বঞ্চিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। রাখাইন তথা সমগ্র মিয়ানমারে খাদ্য ও মানবিক সহায়তা দরকার হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সুযোগ এবং তহবিল হ্রাস পাওয়ার কারণে সেখানে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারছে না। রাখাইনে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকাতে থাকায় তাদের নিজ এলাকায় ফিরে আসা সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে তাদের খবর নেই বললেই চলে। বিশ্ব যেন তাদের ভুলতে বসেছে।

রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এবং মিয়ানমারের আসন্ন নির্বাচনের উপর রাখাইন জনগণের আস্থা না থাকার কারনে রাখাইন রাজ্যে আদৌ নির্বাচন হবে কিনা সে বিষয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এর ফলে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আরকান আর্মির সঙ্গে নির্বাচিত সরকারের কি ধরনের সমঝোতা হবে তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। রাখাইনে বাস্তুচুতি ও খাদ্যাভাব রাখাইনের জনগণের উপর চাপ ফেলছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ঘোষণা করেছে, মিয়ানমার বিশ্বব্যাপী পঞ্চম সর্বাধিক খাদ্য-নিরাপত্তাহীন দেশ। মিয়ানমারে তিন মিলিয়নেরও বেশি মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং ১ কোটি ১৮ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, যা মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশেরও বেশি।

চলমান এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া এবং রোহিঙ্গাদের সেখানে গ্রহণ যোগ্যতার বিষয়ে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করার মত অবস্থা নেই। মিয়ানমার সরকার জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করার বিষয়ে তারা কতটুকু আগ্রহ দেখাবে তা অনুমেয়। রাখাইনে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালানো সম্ভব না হওয়ায় সেখানে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের মানবেতর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সহায়তা ক্রমশ কমে আসার প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি যুক্তরাজ্য এবং কাতার যৌথভাবে বাংলাদেশে অবস্থারত রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়কে সহায়তা করার জন্য ১১.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল ঘোষণা করেছে। এই তহবিল রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা চলমান রাখতে এবং পরিবেশ সুরক্ষা প্রচেষ্টা জোরদার করবে। দেশ দুটি একসঙ্গে নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং আরো টেকসই পরিবেশ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানায়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যৌথভাবে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। এ প্রস্তাবে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং তাদের নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য নতুন করে বৈশ্বিক প্রচেষ্টা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্বের ১০৫টি দেশ এ প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, এর ফলে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উঠে এসেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত কোনো সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আরাকান আর্মিকে সঙ্গে রাখতেই হবে এবং তাদের সহযোগিতায় এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার বিরোধ মেটানোর জন্য কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যুক্ত সকল পক্ষকে নতুন নতুন উদ্যোগ ও উৎস চিহ্নিত করে মানবিক সহায়তা চলমান রাখতে হবে। মিয়ানমারে সৃষ্ট যেকোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্যও প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে। এই জটিল সমস্যা সমাধানে সব পক্ষকে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *