রোহিঙ্গাদের ‘মানব ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে আরাকান আর্মি

Uncategorized

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। একদিকে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অন্যদিকে নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ‘মানব ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে তাদের চরম মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।

যুদ্ধের ময়দানে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক ঢাল হিসেবে ব্যবহার এবং শ্রমদাসে পরিণত করার ফলে রাখাইনজুড়ে এখন এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মির কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নির্যাতনের কারণে সৃষ্টি হয়েছে কৃত্রিম খাদ্যসংকট, যার ফলে অনাহারে মৃত্যুর প্রহর গুনছে হাজারো রোহিঙ্গা পরিবার।

সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক 
সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, তার আঁচ এসে লাগছে বাংলাদেশ সীমান্তেও। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তে নিয়মিত মর্টার শেল ও ভারী গোলার বিকট শব্দে এপারের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে এবং কৃষিজমিতে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকছেন। আরাকান আর্মির এই হঠকারী যুদ্ধ কৌশলের কারণে বাংলাদেশ সীমান্তে এখন যুদ্ধকালীন অস্থিরতা বিরাজ করছে।

সম্প্রতি প্রাণ বাঁচাতে রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা এক রোহিঙ্গা পরিবারের বর্ণনায় আরাকান আর্মির নৃশংসতার চিত্র ফুটে উঠেছে। রাখাইন রাজ্যের বুথিঢংয়ের বলিপাড়া থেকে দীর্ঘ দেড় মাস জীবনপণ লড়াই করে গত ২০ জানুয়ারি দিবাগত রাতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন বৃদ্ধ নুর কামাল (৬০)। সঙ্গে ছিলেন তার দুই ছেলে, পুত্রবধূ, স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ পরিবারের ৭ সদস্য।

নুর কামাল জানান, সীমান্ত পার হতে গিয়ে তাদের আরাকান আর্মিকে বিপুল অঙ্কের টাকা ও স্বর্ণালংকার দিতে হয়েছে। অর্থাৎ নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সহায় সম্বল কেড়ে নিয়ে তবেই তাদের সীমান্ত পার হতে দিচ্ছে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। বর্তমানে তারা টেকনাফের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আত্মগোপনে আছেন।

শ্রমদাস ও ‘মানব ঢাল’
নুর কামালের বড় ছেলে হোসেন আলীর ভাষ্যমতে, আরাকান আর্মি রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করার পর রোহিঙ্গাদের জীবন নরকতুল্য হয়ে পড়েছে। আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের দিয়ে বিনাশ্রমে কঠোর পরিশ্রম করাচ্ছে। কাজ শেষে সামান্য খাবার দিলেও কোনো পারিশ্রমিক দিচ্ছে না। অন্যদিকে, যুদ্ধের সম্মুখ সারিতে রোহিঙ্গাদের ‘মানব ঢাল’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, যেন জান্তা বাহিনীর আক্রমণ থেকে তারা নিজেরা বাঁচতে পারে।

কৃত্রিম খাদ্যসংকট ও মানবিক বিপর্যয়
রাখাইনে বর্তমানে কোনো বাজার ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই। আরাকান আর্মির বিধিনিষেধের কারণে রোহিঙ্গারা মাছ ধরতে বা চাষাবাদ করতে পারছে না। ফলে দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভিক্ষ। ত্রাণবাহী সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সেখানে পৌঁছাতে পারছে না।

বাজারে খাদ্যের দাম এখন আকাশছোঁয়া, যা সাধারণ রোহিঙ্গাদের নাগালের বাইরে। ক্ষুধার জ্বালায় শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে এবং কঙ্কালসার হয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গারা এখন একে অপরের কাছে খাবারের জন্য ভিক্ষা করছে, কিন্তু দেওয়ার মতো সামর্থ্য কারো নেই।

গত ২৪ জানুয়ারি দুপুরে কক্সবাজারের লিংকরোড়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। নুর কামাল ও তার ছেলে হোসেন আলী পকেটে টাকা না থাকায় বাসের ভাড়া দিতে পারছিলেন না। এ সময় বাসের হেলপারের গালমন্দ ও হেনস্তার শিকার হন তারা। বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের। তিনি তৎক্ষণাৎ ১২০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করে তাদের উদ্ধার করেন এবং হোটেলে নিয়ে আহারের ব্যবস্থা করেন। পরে তিনি তাদের জন্য দৈনিক মজুরিতে কাজেরও ব্যবস্থা করে দেন।

নজরুল সওদাগর বলেন, তাদের মুখ থেকে যে বর্ণনা শুনলাম, তা সভ্য সমাজে কল্পনা করা যায় না। আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের ওপর যে জুলুম চালাচ্ছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়।

রাখাইনে আরাকান আর্মির এই আগ্রাসন ও রোহিঙ্গাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা কেবল একটি জাতিগত নিধনই নয়, বরং এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। বাংলাদেশ সীমান্তে যে অস্থিরতা ও ক্ষয়ক্ষতির সৃষ্টি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে আরাকান আর্মির অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধতৎপরতা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই ‘মানব ঢাল’ হিসেবে ব্যবহৃত রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *