এশিয়ার নতুন ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ ও আরাকান আর্মির মাদক সাম্রাজ্য

আন্তর্জাতিক এশিয়া মায়ানমার রাজনীতি

মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সক্রিয় আরাকান আর্মি গত কয়েক বছরে তাদের পরিচয় আমূল বদলে ফেলেছে। একসময়কার জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর ‘নার্কো-টেররিস্ট’ বা মাদক-সন্ত্রাসী বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আরাকান আর্মি এখন আর কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করছে না, বরং তারা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি বিশাল মাদক অর্থনীতি বা ‘নার্কো-ইকোনমি’ গড়ে তুলেছে । তারা মায়ানমারের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের সনাতন কাঠামো ভেঙে বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক একটি ‘নতুন গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ প্রতিষ্ঠা করেছে, যার বার্ষিক আয় আনুমানিক ১০০ কোটি ডলার বা তারও বেশি । এই বিপুল অর্থ তারা ব্যয় করছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ক্রয়, ড্রোন প্রযুক্তি সংগ্রহ এবং তাদের কথিত প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনার কাজে, যা সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এক নজিরবিহীন হুমকি ।

আরাকান আর্মির এই মাদক সাম্রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব, যারা বিচ্ছিন্নতাবাদের আড়ালে মূলত একেকজন মাফিয়া ডন বা ‘ড্রাগ লর্ড’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সংগঠনের প্রধান কমান্ডার তোয়ান ম্রাত নাইং এই সিন্ডিকেটের সর্বাধিনায়ক, যিনি রাজনৈতিক কভারের আড়ালে এই অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করেন । তার ডেপুটি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ন্যো তোয়ান অং , যিনি পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন, তিনি এই মাদক ব্যবসার মূল আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করছেন । তার তদারকিতেই মাদকের আন্তর্জাতিক রুট, মানি লন্ডারিং এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়। এছাড়া কর্নেল কিউ মিয়াট ও এবং কর্নেল কিউ হান -এর মতো শীর্ষ কমান্ডাররা সরাসরি বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তে মাদক পরিবহনের তদারকি করেন । তাদের নির্দেশেই মায়ানমারের শান ও কাচিন রাজ্য থেকে কাঁচামাল এবং উৎপাদিত মাদক আরাকান ও চিন রাজ্যের দুর্গম পাহাড়ি ল্যাবরেটরিতে আনা হয় এবং সেখান থেকে প্রক্রিয়াজাত হয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার করা হয় ।

বাংলাদেশের জন্য আরাকান আর্মির এই উত্থান অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। আরাকান আর্মি এখন মায়ানমারের ‘ওয়েস্টার্ন করিডোর’ বা পশ্চিম উপকূলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় তারা সরাসরি টেকনাফ ও কক্সবাজার সীমান্তকে তাদের প্রধান ‘এক্সিট পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করছে । তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর কৌশলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এই বাণিজ্যের বলির পাঁঠা বানাচ্ছে। একদিকে তারা রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়ন চালিয়ে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করছে এবং পালানোর সময় তাদের কাছ থেকে মাথাপিছু ৩০০০-৫০০০ ডলার পর্যন্ত ‘পলায়ন ফি’ বা ‘Fees to Flee’ আদায় করছে । অন্যদিকে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বা সীমান্তে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের তারা জোরপূর্বক মাদক বহনকারী বা ‘মুল’ (Mule) হিসেবে ব্যবহার করছে । গোয়েন্দা তথ্যে আরও উঠে এসেছে যে, আরাকান আর্মি এখন আর সাধারণ নৌকাতেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ছোট সাবমেরিন বা ‘নার্কো-সাব’ ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে, যা পরে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এমনকি ল্যাটিন আমেরিকার কার্টেলগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে ।

এই মাদক ব্যবসার মূল শিকার বাংলাদেশের তরুণেরা। এটা আমাদের দেশকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে। সরকারের উচিত মাদকবিরোধী এই চক্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *